সর্বশেষ

» নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জনে কিছু কথা ।। শওকত আখঞ্জী

প্রকাশিত: 28. June. 2020 | Sunday

 

মানুষ কখনো একাকী, পরিবার কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতে পারেনা। মানুষ সামাজিক জীব, তাই সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। একজন মানুষ প্রতিনিয়ত পরিবার-পরিজন এবং সমাজের মানুষের কাছ থেকে সব ধরনের সামাজিক আচরণ প্রত্যাশা করে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প- সাহিত্য,তথ্য প্রযুক্তির সময় উপযোগী উন্নয়নে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্বসভ্যতায় দেশ মাতৃকার নাম সমজ্জুল।

কিন্তু একটু ভাবেন মন দিয়ে? আধুনিক সভ্যতার দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রচলিত নিয়ম-নীতি। তার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। অপসংস্কৃতির কারণে বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। বিনষ্ট হচ্ছে সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ, ছিন্ন হচ্ছে পারিবারিক এবং সামাজিক সম্পর্ক। পরিবারে সদস্যদের সুন্দর আচার-আচরণ ব্যহাত হওয়ার দরুন পারিবারিক এবং সামাজিক কাঠামো ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে আমাদের সমাজব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পারিবারিক সামাজিক সমস্যাপূর্ণ।

সমাজ জীবনে চলার পথে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, বর্তমানে সমাজে চলছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম দুর্ভিক্ষ। কিন্তু এই সমাজ থেকে রাষ্ট্রের সুখ-সমৃদ্ধির সুত্রপাত। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কল্যাণ একজন বিবেকবান মানুষের কাম্য। আপনি মনোযোগিতা নিয়ে সমাজ ব্যবস্থার দিকে তাকালে বুঝতে পারবেন বর্তমান প্রেক্ষাপটের প্রকৃত রুপ।

পরিবার এবং ব্যক্তিগত ভাবে থাকতে হবে একে অন্যের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা,স্নেহ, আত্নবিশ্বাস এবং আস্থা।
একটু যদি চিন্তা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন সমাজ নৈতিকতা ও মানবিকতা সংস্কৃতি আজ কোন প্রেক্ষাপটে আছে। আজকাল মানুষের আবেগ অনুভূতির মাত্রাবোধ কমে যাচ্ছে। লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন প্রতিটা মানুষ শান্তির সন্ধানে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিবেকবান মানুষ এবং সমাজকর্মীদের সক্রিয় হতে হবে। নীতি নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অচলাবস্থা রোধে জাগ্রত করতে হবে সমাজের সর্বস্থরে। ফলে প্রতিষ্ঠা হবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ।

নীতি হচ্ছে একজন মানুষের আচরণের মাফকাঠি। প্রত্যেক সমাজে আচরণ পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মাধীন চলে। নীতিহীন সমাজ হয় অনিশ্চিতার ভরপুর। নৈতিকতা হলো আচার-আচরণ, চরিত্র গুণাবলী । নৈতিকতার মধ্যে বিদ্যমান কিছু নিয়মাদি আছে যার নিয়মে প্রত্যেক মানুষ তার বিবেকবোধ এবং ন্যায়বোধ ধারণ করে। নৈতিকতা বলতে এক ধরণের মানসিক অবস্থা যা একজন মানুষ তার পরিবারের ও সমাজের মঙ্গল কামনা করে ভালো কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। যেমন সত্য বলা, সৎ পথে চলা, অন্যায় ভাবে কাউকে কষ্ট না দেয়া এগুলো মানুষের নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশ।

মূল্যবোধ হচ্ছে মানুষের আচরণের ক্ষেত্রে প্রভাববিস্তারকারী ধারণা বা আদর্শ। সমাজে মানুষের যা কিছু করা উচিত, যা কিছু মঙ্গলজনক মনে করে তার প্রকৃত রূপই হচ্ছে মূল্যবোধ। সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজন সামাজিক স্থিতিশীলতা। প্রয়োজন নৈতিকতা, মূল্যবোধের চর্চা ও বিকাশ সাধন। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উপাদান তথা সততা, কর্তব্য, ধৈর্য্য, শিষ্টাচার, উদারতা, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমত্বাবোধ, জবাবদিহিতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি।

“জন্মগতভাবে “মানুষ” হিসাবে পরিচিতি পেলেও ‘মনুষ্যত্ব’ অর্জন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে পারিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরিবার হলো একজন মানুষের প্রাথমিক শিক্ষালয় কিন্তু বর্তমানের সমাজচিত্র ভিন্ন। যথার্থ আদর্শের অভাবে পরিবারগুলো এখন ভোগবিলাস ও পরশ্রীকাতর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা ও ধনবাদী ধ্যান-ধারণায় গড়ে উঠেছে ভারসাম্যহীন সমাজ,আর এই ভাবনাগ্রস্ত সমাজের মানুষ কেউ কারো বন্ধু নয়। প্রত্যেকে পরোক্ষ ভাবে একে অপরের ক্ষতিসাধনে মগ্ন।
তা থেকে মুক্তির জন্য প্রত্যেককে নিজের প্রয়োজনে ভূমিকা পালন করতে হবে এই সামাজিক ব্যধি অবক্ষয় রোধে।

মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী নৈতিক চরিত্রের মানুষজন দেশ ও জাতির গর্ব। সত্যকে সত্য বলা, অন্যায়কে অন্যায় বলা এবং ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যার ভেদাভেদ বুঝে নিজের মানবিক গুণাবলি দ্বারা সমাজকে আলোকিত করা প্রয়োজন। কারণ নৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া মনুষ্যত্ব অর্জন করা সম্ভব নয়।

কাজী মোতাহার হোসেন বলেছেন, ‘জীবন বৃক্ষের শাখায় যে ফুল ফোটে, তাই মনুষ্যত্ব। মানুষের অন্তরের মূল্যবোধ তথা বিশ্বাস, প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দ সম্পর্কে আনন্দ জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে।’ নীতিকর্ম বিহীন সে মানুষ সামাজিক হতে পারেনা। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় অবনতি হলে সেই সমাজ ধ্বংসের প্রান্তে চলে যায়। একজন মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ কতটুকু নিম্ন পর্যায়ে ধাবিত হয়েছে তা অবগত । কেন? নৈতিক মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ! তার কারণ বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের আধিপত্য।
নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মনুষ্যত্ববোধ, মূল্যবোধের অভাবে আজ সমাজে সামাজিক সমস্যাবহুল।

আমাদের প্রয়োজন সচেতন হওয়া। প্রত্যাশা এই, উন্নত এবং সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একজন আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে হবে। যখন একটি দেশে নৈতিকতা মূল্যবোধ গড়ে উঠতে সহায়ক হবে তখন মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। অবশ্যই আছে আমাদের মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাস। চেষ্ঠা করলে সততা, নীতি নৈতিক মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। একনিষ্ঠতা এবং দায়িত্ব, ন্যায় শৃঙ্খলাবোধ থাকলে ব্যক্তি জীবন যেমন সুখকর হয়, ঠিক তেমনি সমাজ জীবনেও আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি।
*তত্ত্ব নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধ *

লেখক
শওকত আখঞ্জী
উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩৮ বার

[hupso]
Shares