সর্বশেষ

» সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ।। মোঃ দিলওয়ার হোসেন বাবর

প্রকাশিত: 11. November. 2020 | Wednesday

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ।। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব :

ত্রিশলক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে সুদীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই সুপ্রিয় মাতৃভুমি লাল সবুজের বাংলাদেশ। আমাদের এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পিছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, যাদের সুদক্ষ নেতৃত্বে ও পরিচালনায় এত অল্প সময়ের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি, যাদের নাম এদেশের মক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের বা মুজিব নগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গঠিত সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিই ছিলেননা, তিনি ছিলেব আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও পরচালক এবং বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় নেতা।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার যমোদল দামপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইতিহাসে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। আইন শাস্ত্রের প্রতিও তার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তাই ১৯৫৩ সালে তিনি এল এল বি ডিগ্রি ও অর্জন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলামের রাজনীতির প্রতি একটা প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তাই দেখা যায় যে ছাত্র জীবনেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই ১৯৪৬-৪৭ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সহ সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বাঙালি জাতির ইতিহাস আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি জাতির অন্যতম অর্জন হল রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে মায়ের ভাষা বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন আমাদের এই মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ভাষা সৈনিক। তিনি ভাষা আন্দোলন চলাকালীন সময়ে গঠিত সর্বদলীয় এ্যাকশন কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন অন্যতম মেধাবী ছাত্র। তিনি তার মেধার পরিচয় দিয়ে ১৯৪৯ সালে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্বিস পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কর বিভাগের একজন অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু সরকারি চাকুরীর কঠোর আইন কানুন তার ভাল লাগতনা।

তাই দেখা যায় যে মাত্র দুই বৎসর ঐ চাকুরী করার পর তিনি পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৫১ সালে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এইখানে কয়েক বৎসর কাজ করার পর আবার তিনি অধ্যাপনা পেশাও ত্যাগ করে ময়মনসিংহ শহরে আইন ব্যবসা শুরু করেন।

আইন পেশার পাশাপাশি তিনি আবার সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার অভাবনীয় রাজনৈতিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার ফলে তিনি সকলের কাছে অত্যন্ত সুপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতায় পরিণত হন। তারি ফলশ্রুতিতে ১৯৫৭ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার অসামান্য যোগ্যতার ফলে ১৯৬৪ তিনি আওয়ামীলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি নির্বাচিত হন এবং লাগাতার ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ঐ পদে সমাসীন থেকে দক্ষতা ও যোগ্যতার সহিত ঐ দায়িত্ব পালন করেন।

ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তানে আয়ুব খানের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। তন্মধ্যে ১৯৬৬ সালে সমগ্র দেশব্যাপী ছয় দফা দাবী আদায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করলে তৎকালীন আয়ুব সরকার আওয়ামীলীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধুসহ আওয়মীলীগের অনেক নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে আওয়ামীলীগের সেই দুঃসময়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম শক্ত হাতে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির হাল ধরে দলকে দক্ষতার সহিত সঠিকভাবে সঠিক পথে পরিচালনা করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে আয়ুব বিরোধী  গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হওয়ার সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো মিলে ” ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটি” নামে একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঐ কমিটির অন্যতম প্রথম সারির নেতা নির্বাচিত হন এবং আয়ুব বিরোধী গণআন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন সময়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতা নিরসনের জন্য সেই সময়কার সরকারের সহিত রাওয়ালপিণ্ডিতে বিরোধী দলগুলোর গোল টেবিল বৈঠকে তিনি আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭০ সালে সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহ-১৭ নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচন করে তৎকালীন সময়ে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামীলীগ সংসদীয় দলের উপনেতা নির্বাচিত হন।

পরবর্তীতে ইয়াহিয়া সরকার আওয়ামীলীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করলে সমগ্র দেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভুমিকা পালন করেন। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়ার মধ্যে যখন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সঙ্গী।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের আওতায় ঢাকা শহরে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালির উপর নৃশংস ও নারকীয় হত্যাকাণ্ড শুরু করে এবং গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাসায় আক্রমণ করে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ঐ সময় আওয়ামী লীগের চরম দুর্দিনের সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের হাল ধরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিব নগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি করে এই সরকার গঠিত হয়। নবগঠিত এই সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী কারাগারে বন্দী থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বাঙালি জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এবং বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী কারাগার হতে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।১২ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রীত্বে নতুন মন্ত্রী সভা গঠিত হলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঐ সরকারের শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়ি পালনের মাধ্যমে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে বাঙালি জাতিকে একটি সংবিধান উপহার দেন। সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে কমিটি তৈরী করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেই সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একজন শক্তিশালী ও সক্রিয় সদস্য মনোনীত হয়ে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। তাছাড়াও ১৯৭২ সালে তিনি আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি উপনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহ-২৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর প্রধান মন্ত্রীত্বে আবারও সরকার গঠিত হলে তিনি ঐ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন এবং ২৫/০১/১৯৭৫ ইং তারিখ পর্যন্ত ঐ দায়িত্ব পালন করেন।ঐ সময়ে তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পের যথেষ্ঠ উন্নতি স্থাপন করেন। এই সময়ে তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে অনেক শিল্প কারখানা জাতীয় করণ করেন।

১৯৭৫ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম আবারও বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্টিত হন। এই সময় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ বাকশাল গঠিত হলে তিনি এর সহ সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হলে দেশে সামরিক আইন জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল ষড়যন্ত্রকারী ও সুবিধাভুগী খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে তার পুরনো কয়েকজন লোভী, স্বার্থপর, বেঈমান ও ভীরু কাপুরুষ সহকর্মীদের নিয়ে মন্ত্রী সভা গঠন করেন।

খন্দকার মোশতাক আহমদ বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসী সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলামকে তার মন্ত্রী সভায় যোগদানের প্রস্তাব দিলে তিনি সাহসিকতার সহিত ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখান করেন। পরে প্রথমে তাকে গৃহবন্দী করা হয় এবং পরে ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অন্যান্য জাতীয় তিন নেতার সহিত সৈয়দ নজরুল ইসলামকেও ঢকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরে তাকে অন্যান্যদের সাথে ঢাকায় বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন ঘনিষ্ট সহচর। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ও চৌকস রাজনীতিবিদ এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের একজন যোগ্য উত্তরসুরী। তিনি আজীবন এদেশের মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য জাতির জনকের পাশে থেকে কাজ করে গেছেন। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন আবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। এদেশের মানুষ চিরদিন থাকে শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করবে।

মোঃ দিলওয়ার হোসেন বাবর
সহকারী অধ্যাপক : গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ।
সমন্বয়কারী : বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংসদ, সিলেট।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৭ বার

[hupso]
Shares