সর্বশেষ

» মনুষ্যত্বেই হউক মানুষের বড় পরিচয় ।। শওকত আখঞ্জী

প্রকাশিত: 08. November. 2020 | Sunday

মনুষ্যত্বেই হউক মানুষের বড় পরিচয় : শওকত আখঞ্জ

“মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব” জন্মগত ভাবে মানুষ হিসাবে পরিচিতি পেলেও মনুষ্যত্ব অর্জন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া! এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে পারিবার-সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরিবার হলো একজন মানুষের প্রাথমিক শিক্ষালয় কিন্তু বর্তমানের সমাজচিত্র ভিন্ন! যথার্থ আদর্শের অভাবে পরিবার গুলো এখন ভোগবিলাস ও পরশ্রীকাতর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে! আত্ম-কেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা ও ধনবাদী ধ্যান-ধারণায় গড়ে উঠেছে ভারসাম্যহীন সমাজ!
আর এই ভাবনাগ্রস্ত সমাজের মানুষ কেউ কারো বন্ধু নয়! প্রত্যেকে পরোক্ষ ভাবে একে অপরের ক্ষতি সাধনে মগ্ন! তা থেকে মুক্তির জন্য প্রত্যেককে নিজের প্রয়োজনে ভূমিকা পালন করতে হবে এই সামাজিক ব্যধি অবক্ষয় রোধে।

কাজী মোতাহার হোসেন বলেছেন “জীবন বৃক্ষের শাখায় যে ফুল ফোটে তাই মনুষ্যত্ব,মানুষের অন্তরের মূল্যবোধ তথা বিশ্বাস, প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দ সম্পর্কে আনন্দ জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে নীতিকর্ম বিহীন সে মানুষ সামাজিক হতে পারেনা”।
নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় অবনতি হলে সেই সমাজ ধ্বংসের প্রান্তে চলে যায়।

মানুষের চারিত্রিক গুণাবলির অন্যতম দিক হলো মানুষ মানুষকে শ্রদ্ধা-স্নেহ করা। জাগতিক প্রত্যেক ধর্ম অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে বিশেষভাবে তাগিদ দেয়া হয়েছে। ইহজগতে যার যতটুকু সম্মানের যোগ্যতা দেয়া হয়েছে? তাকে ঠিক ততটুকু সম্মান করতে হবে। স্রষ্টার সৃষ্টির রহস্যময়ের অন্যতম উপাদান হলো মানুষ! স্রষ্টা এই পৃথিবীতে কাউকে আগে পাঠান! কাউকে বা পরে পাঠান! বয়সের দিক থেকে কেউ হই বড় কিংবা কেউ হই ছোট! এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে বৃদ্ধরাই সমাজে সবচেয়ে বড়,বয়সের দিক থেকে যারা বড় তারাই সম্মান পাওয়ার যোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে কখনো বড়-ছোটর মধ্যে কখনো তারতম্য হয় শক্তি-সামর্থ্যরে দিক থেকে কিংবা কখনো বিশ্লেষণ করা হয় জ্ঞান-প্রজ্ঞার দিক থেকে, আবার কখনো বিচার করা হয় পদ-পদবী ক্ষমতার দিক থেকে।

তাই তো পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট। সুখ-শান্তিতে বসবাস করা পাশাপাশি নিয়ম শৃংখলিত ভাবে সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে বড়কে সম্মান ও ছোটকে স্নেহ করতে হবে।

আল্লাহ পাকের সৃষ্ট জীবের মধ্যে মানুষই সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, মানুষ স্রষ্টার অন্যতম সৃষ্টি! তাই জগতের যাবতীয় সৃষ্টিজীব মূলত মানুষের সেবায় নিয়োজিত। পৃথিবীতে ভাল মন্দ সব ধরনের মানুষ রয়েছে। নানান পেশার মানুষ রয়েছে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি করা এই জগতে। সকল মানুষ যেমন এক নয়, তেমনী সকল মানুষের মনুষ্যত্বও ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে কেউ রয়েছে ধনী,কেউবা আবার গরীব। কারো আয়ের উৎস সৎভাবে আবার কারো আয়ের উৎস অসৎভাবে।
সকলেই কোনা না কোনো পেশায় জড়িত। তার পরি প্রেক্ষিতে কেউ হন কৃষক, কেউ বা ব্যবসায়ী, কেউ হন শিক্ষক, আবার কেউ চেয়ারম্যান, কেউ বা এমপি কেউ বা হন মন্ত্রি অথবা কেউ বা সর্বস্ব হারিয়ে হন নিঃস্ব! কারো কারো পেশা সমাজ সেবা অথবা কারো ধ্যান খেয়াল মানবিক কল্যাণকর কাজ করা,কেউ সাংবাদিকতা। সব পেশা গুলো কিন্তু একেকটা সম্মানীত পেশা। আমারা সকলেই কোনা না কোন পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। আমরা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে যদি আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব থাকে তবে আমরা সেই পেশাটাকে সৎভাবে ব্যবহার করবো। মানুষের পেশা তুলনা করলে দেখি?কারো পেশাকে সম্মান দেওয়া হয়! আবার কারো কারাও পেশাকে ঠিক তদরুপ অসম্মান করে থাকি! আমরা কিছুক্ষনের জন্য ভুলে যাই যে সেও একজন মানুষ! সৃষ্টিকর্তা আমাদের সকেলকে একই মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন! তার কাছে সকলের মান একই। একজন সমাজের সর্বস্বহারা মানুষের শরীরে যে রক্ত মাংস রয়েছে! ঠিক তেমনি ভাবে সমাজের উচু মাপের মানুষের শরীরেও সেই ধরনের রক্ত মাংস দিয়ে গঠিত! কারণ আমরা সকলে মানুষ।
যতোসব ভেদাভেদ সবকিছু আমরা পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি! একজন গ্যরেজের ছেলে যদি টাকার অভাবে পড়া লেখা করতে না পারে এবং বাধ্য হয়ে গ্যরেজের মেকানিকের পেশা বেছে নেয় সেটা কি তার অপরাধ? তাই বলে কি সে মানুষ নয়? এজন্য কি সকলের সামনে তাকে অপদস্থ এবং ছোট করবো । আমাদের কাছে কিছু কিছু পেশাকে ছোট করে দেখার স্বভাব এখনো যায়নি! আমরা সবসময় নিজেদেরকে সম্মানের আসনে বসিয়ে রাখি আর সমাজের নিম্ন শ্রেনীর পেশাকে অসম্মানের আসনে বসিয়ে দেখি।

আমাদের যখন জুতো ছিড়ে যায় আমরা তখন ঠিকি দৌড়ে মুচির দোকানে গিয়ে জুতো সেলাই করে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু পরোক্ষনে আমরা সেই মুচিকেই সমাজে ছোটভাবে দেখি। আমরা স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত থেকে বাসাই যখন ফিরি তখন আমরা ঠিকি কোনো না কোনো গাড়িতে করে আসি। আর ভাড়া দেওয়ার সময় অনেকে আবার তাদের সাথে ঝগড়া করতেও দ্বিধা করিনা। এমনও অনেকে রয়েছে যারা কয়েকটা টাকার গরমে তাদের গায়ে হাত তুলতেও চিন্তা করিনা! অথচ তারা না থাকলে আমাদের কি হতো তা আমরা ভেবে দেখি না। ঠিক পরক্ষণে আবার তাদেরকে আমরা অসম্মান করতে একটুও অস্বস্থিবোধ হয়না। আমরা যারা নিজেদের অতিরিক্ত সম্মানি ভাবছি? আমরা হয়তো ভুলে যাই যে, সমাজের এ ধরনের মানুষ ছাড়া আমরা নিজেরাই অচল। সকলেই পেটের জন্যই দায়বদ্ধ হয়ে রুজিরোজগার উউদ্যেশ্যে কোনো না কোনো কাজ করছে। সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রয়োজন সেটা যাই হোক না কেনো! আমাদের উচিৎ তার সে কাজকে সম্মান করা। আমি নিজেকে উচ্চতায় বসিয়ে রাখলে কখনো সম্মানীত হতে পারবো না! সম্মানী হতে হলে নিচেও আসতে হয়। নিচের মানুষদেরও সম্মান দিতে হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে সম্মান দিলে আমরা সম্মান পাবো। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা সৃষ্টি সেরাজীব হিসাবে সত্যিকারের মানুষ হয়ে বেচে থাকতে চাই। যেমন একজন চায়ের দোকানের কাজের ছেলেটারও একটা স্বপ্ন থাকে। হয়তো তার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যায়! কিন্তু সেও তো একজন মানুষ। আমাদের সমাজের বিত্তবানরা সবসময় গরীব, খেটে খাওয়া মানুষদের ছোট করে দেখা বর্তমানে এটা আমাদের ফ্যাশনে পরিণিত হয়ে গেছে! আমাদের মনের ভেতর মনুষ্যত্ব বলতে যে বিষয়টি রয়েছে? পরিতাপের বিষয় সেটি আমাদের বিবেকের অধ্যায় থেকে ক্রমাগত হারিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে! সমাজের কিছু কিছু উঁচু শ্রেণীর মানুষেরা অহংকারী হয়ে তাদের ঘৃনার নজরে দেখে, মানুষ হিসেবে এটাই তাদের কী প্রাপ্য? প্রশ্নটা থেকেই গেল আমার আপনার বিবেকে আমরা কে কতোটুকু সদয়বান। কোনো এক কবি বলেছেন, মানুষ মানুষের জন্য আর জীবন জীবনের জন্য। সেই কবির কথা আজ আমরা ভুল প্রমানিত করছি। এখন মানুষ আর মানুষের জন্য নেই! বাস্তবে মানুষের প্রতি মানুষের নেই কোনো দয়া! নেই কোনো মায়া! যা আছে তা দিয়ে শুধু স্বার্থ খুজেফিরি!আমরা নিজেদের নিজেরাই প্রশ্ন করি? তাহলে আমরা আমাদের ভেতর থেকে সঠিক প্রশ্নের উত্তর উপলদ্ধি করতে পারবো। আমাদের ভেতরের যে মনুষ্যত্ব রয়েছে আমরা সেটাকে একসময় বিলিন করে দিবো অমানুষের রাজ্যে। আমাদের ভেতর থাকবেনা কোনা মনুষ্যত্ব। হারিয়ে যাবে মানবতা। তখন ভুলে যাবে সকলে মানুষ মানুষের জন্য এ কথা। তাই আমাদের ভেতর জাগিয়ে রাখতে হবে নিজেদের মনুষ্যত্ব। পরিষ্কার করতে হবে নিজেদের বিবেক।  মনুষ্যত্ব ছাড়া যেমন মানুষ হওয়া যায়না! ঠিক তেমনি বিবেকহীন ব্যাক্তিও মানুষ হতে পারে না কখনো! বিবেক এবং মনুষ্যত্ব এই দুটো ঠিক রেখে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই জয় হবে মানুষের এবং মনুষ্যত্বের।

লেখক
শওকত আখঞ্জী
উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৫০ বার

[hupso]
Shares