সর্বশেষ

» সেলিম ভাইয়ের মৃত্যু : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী একজন কলম সৈনিকের বিদায়

প্রকাশিত: 25. October. 2020 | Sunday

সেলিম ভাইয়ের মৃত্যু : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী একজন কলম সৈনিকের বিদায়

না ফেরার দেশে চলে গেলেন সিলেটের একজন নম্র, ভদ্র, সজ্জন, বিনয়ী ও অমায়িক স্বভাবের কলম সৈনিক আজিজ আহমদ সেলিম ভাই। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন যাবত সিলেট সিএমএইচ এ চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তীতে সিএমএইচ এ চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সেলিম ভাই ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের অন্যতম একজন প্রবীণ সাংবাদিক। তিনি দীর্ঘদিন যাবত নিজেকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির কাজে নিয়োজিত রেখে ছিলেন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখিই ছিল তার মূল পেশা। তিনি তার পেশাগত জীবনে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। সর্বশেষে তিনি সিলেটের দৈনিক উত্তর পূর্ব পত্রিকায় যোগদান করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সিলেটের এই জনপ্রিয় দৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত পত্রিকা দৈনিক উত্তর পূর্বের প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাই ছিলেন একজন নিভৃতচারী ও প্রচার বিমুখ সাংবাদিক। তিনি নিজেকে কখনও জনসমক্ষে তোলে আানার চেষ্টা করতেন না। তিনি নীরবে নিভৃতভাবে তার জগতে বিচরণ করতেন। এটা ছিল তার সহজাত প্রবৃত্তি।এক ধরণের সাংবাদিক আছে যারা নিজেকে সবসময় আড়াল করে রাখতে ভালবাসে। সেলিম ভাইও ছিলেন আসলেই এমনি একজন সাংবাদিক।মমত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টাই করে গেছেন।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাই ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তিনি প্রেসক্লাবকে গভীরভাবে ভালবাসতেন এবং তার উন্নয়নে যথাসাধ্য কাজ করে তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান ও সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাথে আজিজ আহমদ সেলিম ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তাই তাদের আমলে আজিজ আহমদ সেলিম ভাই তাদের মাধ্যমে প্রেসক্লাবের উন্নয়ন সাধনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। আজিজ আহমদ সেলিম ভাই সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেগেছেন। তিনি বাসস সিলেট জেলার প্রতিনিধি হিসেবেও দীর্ঘদিন সফলতার সহিত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের সাথেও তার ভাল একটি সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তিনি বিটিভির সিলেট জেলার বার্তা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন। তাই বলা যায় মিডিয়া ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সিলেট তথা বাংলাদেশের একজন অতি সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাই ছিলেন সিলেটের সুশীল সমাজের একজন অতি পরিচিত ও প্রিয় মুখ। সিলেটের সুশীল সমাজের সাথে তার ছিল এক ঘনিষ্ট সম্পর্ক। দীর্ঘদিন যাবত তিনি সিলেটের সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে গেছেন। আজিজ আহমদ সেলিম ভাই ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক, (সুজন)সিলেটের সভাপতি। সুজনের সিলেট শাখার সভাপতি হিসেবেও তিনি তার দয়য়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য চেষ্টা করে গেছেন। সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তিনি ছিলেন একজন অন্যতম নির্ভরশীল ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃিতিক জগতে কোন সময় কোন সঙ্কট দেখাদিলে তিনি তার সমাধানে সবসময় তার সহকর্মীদের সাথে এগিয়ে আসতেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে আজিজ অত্যন্ত ঘনিষ্ট একটি সম্পর্ক ছিল। লেখালেখি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে বা কোন পরামর্শ গ্রহণের জন্য যখনই আজিজ ভাইয়ের কাছে গিয়েছি তখনেই তিনি ছোট ভাই হেসেবে, একজন বন্ধু হিসেবে আমাকে সবসময়ই যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছেন ও সঠিক পরামর্শ দেওার চেষ্টা করেছেন। তার ছোট ভাই জাবের আহমদ ভাইয়ের সাথে আামার ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা কালীন সময়ে আমি ও জাবের ভাই একসাথে দীর্ঘদিন একসাথে রাজনীতি করেছি এবং পাশাপাশি আমরা একটি সামাজিক সংগঠনও করেছি। সেই সুবাধে ঘন ঘন তাদের বাসায় গিয়েছি। তাই ছোট ভাই হিসেবেও সেলিম ভাই আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমি তার এই স্নেহের কথা কোন দিন ভুলতে পারবনা। তার অমায়িক ব্যবহার ও আচরণের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে ঋণি।

সেলিম ভাই ছিলেন সিলেটের প্রগতিশীল সমাজের একজন প্রগতিমনা মানুষ।সিলেটের প্রগতিশীল প্রত্যেকটি কাজের সাথে তিনি জড়িয়ে থাকতেন। তার চিন্তা চেতনায় ছিল প্রগতির ভাবনা। তিনি সর্বদাই প্রগতিশীল সমাজের কথা ভাবতেন এবং সর্বদাই প্রগতির পথে হাঁটতেন। এই জন্য সিলেটের প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের লোকেরা সর্বদাই তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতেন। একজন প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে আমাদের এই সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তাই তার মৃত্যুতে আমাদের প্রগতিশীল সমাজ তার মত একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে হারিয়ে শুন্যতায় ভুগছে।

সেলিম ভাই ছিলেন একজন কুসংস্কারমুক্ত, আধুনিকমনা ও রুচিশীল মানুষ। তিনি আলো ও সত্য পথের পথিক ছিলেন। তিনি ছিলেন আলো ও সত্য পথের একজন সাহসী সৈকিক। তিনি ছিলেন আলো ও সত্যের একজন পূজারী। তিনি সেই পথেই হাঁটতেন, সেই পথেই চলতেন। তিনি তার লেখনীর সাহায্যে আমাদের এই সমাজে সত্য ও সুন্দরের আলো ছড়াতে কাজ করে গেছেন। আমাদের এই সমাজকে অন্ধকার থেকে টেনে তুলে আলো, সত্য ও সুন্দরের পথে এগিয়ে নিতে তার লেখনীর মাধ্যমে কাজ করে গেছেন।

সেলিম ভাই ছিলেন একজন,অাধুনিক প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। তিনি সংস্কৃতি ভালবাসতেন এবং সংস্কৃতির সেবা করতেন।যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতেন তিনি সর্বদাই তাদের উৎসাহ দিয়ে যেতেন। তিনি নিজেও ভিন্ন সাংকৃতিক সংগঠনের সাথে কমবেশী জড়িত ছিলেন।

সেলিম ভাই ছিলেন একজন সংগঠন প্রিয় মানুষ। তিনি সংগঠনকে ভালবাসতেন এবং সংগঠনের পিছনে অনেক সময় ব্যয় করতেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন সংগঠক। তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেশ কয়েকটি সংগঠনের জন্ম দিয়ে গেছেন। জীবিত অবস্থায় সিলেটের বিভিন্ন সংগঠনের সহিত জড়িত ছিলেন। তিনি সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে কাজ করে গেছেন।

সেলিম ভাই ছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী একজন কলম সৈনিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবি। তিনি হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করতেন, কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতেন। আর তার কলমের মাধ্যমে তা কাগজে লিখে প্রকাশ করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখালেখিও করেছেন। আজিজ আহমদ সেলিম ভাই আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে লালন করেছেন এবং সেই পথেই হেঁটেছেন।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাই সিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতি ও আদর্শে বিশ্বাসী একজন মুজিব সৈনিক। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একজন ভক্ত ও তার অনুরাগী। বঙ্গবন্ধুর নীতি ও অাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং আমাদের এই সমাজে তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি কাজ করে গেছেন। তাইতো আমরা দেখেছি অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন শিরু ভাইকে সাথে নিয়ে তিনি সিলেটে গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সিলেট। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, লেখক ও রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন শিরু ভাই যখন বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সিলেট জেলা কমিটির আহবায়ক ছিলেন, তখন সেলিম ভাই ছিলেন সেই আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপরড়া সমাপ্ত করে একটা কলেজের অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছি। আমি নিজেও তখন তাদের নেতৃত্বে এই সংগঠনের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করেছি।

সেলিম ভাই ছিলেন একজন প্রগতিমনা, অাধুনিক ও রুচিশীল লেখক। তিনি সর্বদা লেখালেখির জগতে বিচরণ করতেন। আমরা তার অনেক লেখা পেয়েছি। তাছাড়া তিনি একজন ভাল কলাম লেখকও ছিলেন। তিনি সমসাময়িক কালের বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিখতেন। তার লেখার অনেক ভক্ত রয়েছে। আমি নিজেও তার লেখার একজন ভক্ত।

আজিজ আআহমদ সেলিম ভাই ছিলেন সিলেটের একজন অন্যতম নামকরা ছড়াকার। সিলেটে যে কয়েকজন ছড়াকার রয়েছেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি অনেক সুন্দর সুন্দর ছড়া লিখেছেন।ছড়ার জগতে ছিল তার অগাধ বিচরণ। ছড়া নিয়ে তিনি যথেষ্ট কাজ করেছেন। এই ব্যাপারে তার ছড়ার বইও বেরিয়েছে। তার প্রকাশিত ছড়ার বই সিলেটের পাঠক সমাজে সমাদৃত হয়েছে।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাই অতি তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।তিনি আসলে বড় অসময়ে চলে গেলেন। দেশে যখন মুজিব বর্ষ চলছে, মুজিব বর্ষ যখন সমাপ্তির পথে, যখন আমাদের সিলেটে এই সময়ে আজিজ ভাইয়ের বড় প্রয়োজন ছিল, তার নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন ছিল, তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার ছিল, ঠিক সেই সময়ে আজিজ আহমদ সেলিম ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। তার কাছে আমাদের আরও অনেক প্রতাশা ছিল, আমাদের আরও পাওয়ার ছিল। আমরা মুজিব ভক্তরা, আমরা মুজিব প্রেমী পাঠক ও লেখক সমাজ তার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। সিলেটের নাগরিক ও সুশীল সমাজ সলিম ভাইয়ের কাছ থেকে আরও অনেক কিছুই যে আশা করেছিল। আমরা সবাই অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়েছি।

সিলেটে রয়েছে এক শক্তিশালী মিডিয়া জগত।আজিজ আহমদ সেলিম ভাই ছিলেন বর্তমান সিলেটের এই মিডিয়া জগতের এক সর্বজন শ্রদ্ধেয় অভিভাবক শ্রেণীর ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন এই জগতের অন্যতম একজন নীতি নির্ধারক। যে কোন সংকটে এই মিডিয়া জগতে শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করা হত। তাই তার মৃত্যুতে মিডিয়া জগতে অপুরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সিলেটের মিডিয়া জগতের এই ক্ষতি ও এই শূন্যতা সহজে পূর্ণ হবার মত নয়। তাই সিলটের এই জগত আগামীতে ও তাকে শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করবে।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী একজন কলম সৈনিক ও বুদ্ধিজীবি। তাই তার মৃত্যুতে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী ও ঐ চেতনা লালনকারী একজন অগ্র সৈনিককে হারিয়েছি। এই চেতনা ও আদর্শ লালন ও পালনকারী একজন বুদ্ধিজীবিকে আমরা হারিয়েছি। এই সমাজ তাকে আজীবন স্মরণ করবে। আমাদের নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ, লেখক ও পাঠক সমাজ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী সমাজ চিরদিন থাকে শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তার কর্মের মাঝে,বেঁচে থাকবেন তার আদর্শের মাঝে।

আজিজ আহমদ সেলিম ভাইয়ের মৃত্যুুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তার স্মৃতির প্রতি জানাচ্ছি গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমরা তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।

আসুন আমরা সবাই মিলে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের প্রিয় আজিজ আহমদ সেলিম ভাইকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।

মোঃ দিলওয়ার হোসেন বাবর
সহকারী অধ্যাপক,
গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ
সমন্বয়কারী : বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংসদ
সিলেট জেলা শাখা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৬৪ বার

[hupso]
Shares