সর্বশেষ

» ছোটগল্প ।। আওয়াজ তোলো ।। আমেনা খানম

প্রকাশিত: 14. October. 2020 | Wednesday

ছোটগল্প ।। আওয়াজ তোলো।

আমেনা খানম

প্রভার বয়স এখন কতই হবে চব্বিশ কিংবা পঁচিশ। সদ‍্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স শেষ করেছে বছর দেরেক হয়েছে। বসে থাকার মতো মেয়ে প্রভা নয়! আপাতত চাকুরীর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

যেখানে সাধারণত মেয়ে বাচ্চাগুলো মায়ের পিছু পিছু ও আঁচল ধরা হয় সেখানে ছোট্ট বেলা থেকেই প্রভা ছিল ভীষণ সাহসী। ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি। প্রভার বয়স তখন কতই তিন কি সাড়ে তিন, ঘরের ভেতর ব‍্যাঙ ঢুকে পড়ায় প্রভার মা ও তার বড় বোন শোভার সে কি দাপানো। আর প্রভা ব‍্যপারটি বুঝে সুন্দর মতো ফুলঝাড়ু দিয়ে ব‍্যঙটিকে চেপে ধরে বাইরে বের করে দিয়ে বলল মা এই ব‍্যাঙকে দেখে ভয়ে চিৎকার করছিলে?

প্রভার মা সুমনা, নারী ও সমাজ কল‍্যাণ অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে নিয়োজিত আছেন।প্রথম দিকেই তিনি সাধারণ ঘরোয়া বউই ছিলেন কিন্তু পরবর্তী জীবনের চলমান প্রেক্ষাপট পরোক্ষভাবে সাজাতে বাধ‍্য করেছেন তার প্রাক্তন স্বামী মো: আসমত শিকদার। তার বিচারে মেয়েদের মধ‍্যে যারা শুধুমাত্র মেয়ের মা তাদের স্বামীর প্রতিটি বিচার বিবেচনা আপোষহীনভাবে মেনে নিতে হবে।গলায় আওয়াজ থাকলেও তা প্রকাশ পাবে শুধু দুটি শব্দের ব‍্যবহারের মধ‍্য দিয়ে। এক-হ‍্যাঁ আর দুই -না।

আজব! জীবন কখনো এভাবে আবার চলে নাকি।না এভাবেই চলতে হবে। নাহলে সংসারে কোথাও জায়গা নেই। কি চমৎকার আইন প্রনেতা তিনি!নিজের আইন নিজেই জারি করেন ও বাস্তবায়নকারীও নিজেই। অন‍্য কোন নিয়ম বা আইন কেউ এদেরকে আটকায় না।কখনো শুনেছেন কি? বছর খানিক হলো অমুকের বউকে, কি নির্যাতনটাই না করে, সাথে সাথেই আপনি বিচার না চাইতেই স্বয়ং যে সকল অনাস্থা আইন ভঙ্গরূপে বিবেচিত তা এমনি এমনিই প্রতিরোধ‍্য! তাই, সাহস বুঝি আসমত শিকদারদের আমরাই দিয়ে রেখেছি!কখনো শুনেছেন পাশের বাড়ির বউটির প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় তার প্রতিবেশি বা প্রতিবেশিনীকে ছুটে আসতে?না পারলেও আইনের সাহায্য নিতে?

তবুও এদের মধ‍্যে এখনো কিছু ভালো মানুষ আছে বিধায় ভালো আর মন্দের তারতম‍্যে ভালো মানুষেরা এগিয়ে আছেন!

যে পরিচিতা প্রাণপ্রিয় পরচর্চায় নিত‍্যসঙ্গী ভাবীটি সময় অসময়ে গালগল্প করে কান ঝালাপালা করেন তিনিও বিপদের মুহুর্তে উধাও। অন্তত তার স্বামী লোকটি ব‍্যপারটি অনুমান করতেও বাঁধাগ্রস্ত হবেন এই ভাবীর দ্বারাই। বলবে,বাদ দাও স্বামী স্ত্রী ওরকম একটু আধটু হয়েই থাকে। সব একটু পরে দেখবে ঠিক হয়ে যাবে। এরকম কত হয়!

সত‍্যিই বুঝি তাই!সব ঘা এর মলম আবিষ্কৃত হলেও মনের ঘা এর মলমের নাম কারো জানা থাকলে জানাবেন।

সুমনা নিজেই জানতো না তার অপরাধ কোথায়?
দেখতে শুনতেও তো মন্দ না। তাহলে সমস‍্যা কোথায়?
আমরা কিছু হলেই, কি সুন্দরভাবেই না নারীকে বিচার বিশ্লেষণ করতে লাগি। কেন? এতই যে সস্তা!অনেকেই বোঝান সারাজীবনের ধাক্কা সামলাবে বলেই বউ করা হয়েছে!
তাদের জন‍্য বলছি-সেটি কি গলাধাক্কা?

আমি এখন কাউকে সমর্থক শব্দ বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চাইছি না!
শুধু একটি কথায় বলতে চাই নিজ কে যেভাবে বিচার বিশ্লেষণ করতে জানি অন‍্যের বেলায় অনুভূতিগুলো কোথায় লুকিয়ে রাখি?

জানি মনমতো উত্তর পাবো না! বলি, ওগুলো সব সিন্দুকে তুলেই রাখুন! এই তো আর কদিন আপনার পরবর্তী বংশধর আপনার কন‍্যা কিংবা পুত্রীরইতো লাগবে। কিছু চোখের নোনা জলও সঞ্চিত রাখবেন।বুকের ব‍্যথার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ওগুলো আপনাকে একটু হালকা হতে বেশ কাজ দিবে!সেদিনও তো কেউ না কেউ বলবে সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কত দিন সে সময়, দুই মাস, দুই বছর, দুই যুগ নাকি দুই শতাব্দী! করেছিতো অপেক্ষা! দিয়েছি অনেকটি সময়। বড়দের কথার অবাধ‍্য হয়নিতো।তবু সমাধানতো আগের মতোই!

একটি কথা ভুললে কিন্তু চলছে না অনুশাসন ছাড়া কোন কিছুই সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারে না!

সুমনা তার দুটি মেয়ে বাচ্চাদের বুকে করেই অত অত‍্যাচারিত হয়েও সংসারটি বাঁচাতে চেয়েছিলো।কিন্তু ততদিনে তার স্বামী যে কিনা নিজেকে সম্রাট আকবর ভাবেন তিনি নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছেন কোন রকম বাঁধা বিপত্তি ছাড়াই! কি সুন্দর আয়োজন! আবার নতুন বাসর! দু একজন আপত্তি করা ছাড়া সবাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া স্ত্রীরই অপবাদ ও অপপ্রচারে প্রচারণার কাজটি চালান অবলিলায়।

সুমনাকে বাধ‍্য করেছিল তার স্বামী তার প্রিয় সংসার ছেড়ে চলে যেতে। শেষমেষ যে সম্পর্কে এতটি ঘুনে ধরা সেটি টিকিয়ে রাখাটা অযৌক্তিক বলে সুমনারও মনে হয়েছিল। তাইতো সবার নেয়া সিদ্ধান্তটিকেই নিজের জন‍্য শুভ ভেবে রাজি হয়েছিল সমস্ত সম্পর্কের ইতি টানতে।

কতখানি কষ্ট হচ্ছিলো একমাত্র সুমনাদের মত নারীরাই এটি ভালো অনুমান করতে পারবেন!বাকিরা আফসোস আর হায় হায় করেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে থাকেন!

সুমনা শিক্ষিতা তাই এতটুকু অনুধাবন তার মধ‍্যে ছিলো তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে নি।অন্তত যে বাচ্চাদের নিজ বাবার কাছে জীবন হুমকির সম্মুখীন সেখান থেকে একটু কম আরাম-আয়েশে থাকাটা কি খুব বেশিই ক্ষতিকর?

যেই বাবা নিজ কন‍্যা সন্তানকে সন্তান হিসেবে মানেন না তারা কি তার প্রাক্তন গর্ভকালীন সুরক্ষিত আবাসভূমি মাতৃগর্ভেরও ঘোর বিরোধী নন?
ভেবে দেখেছেন কি যখন কাউকে চিনতেন না, তখনো একমাত্র যিনি আপনাকে লালন পালন করে হাওয়া বাতাসে অভ‍্যস্ত করেছিলেন তিনি আর কেউ নন, চিরাচরিত সেই মায়া মুখ, শত ধিক্কার আর বঞ্চনার শিকার, আপনার মা!

সময় পেরিয়েছে কিন্তু বুকের ভেতর জমে থাকা মেঘগুলো সময় পেলেই ঝড়কে খুঁজে নিয়ে আসে।
আছার পাছারে বুকের পাজড়ের হাড়গুলো ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে যায়! সুমনারও তাই হয়!তবু মেয়ে দুটির মুখের দিকে তাকালে কি এক ভীষণ শান্তি আর সাহস পায়। এভাবেই টিকে থাকতে জানতে হবে। বেঁচে থাকতে জানতে হবে। লড়াই করার সাহসের সাথে সাথে অর্জন করতে হবে সেই মানষিকতা যেখানে ন‍্যায়কে শ‍্রদ্ধা আর অন‍্যায়কে না বলার সাহসগুলো বেঁচে থাকে!

প্রভা মাকে বলে মা আমি একজন আদর্শ পুলিশ অফিসার হতে চাই। কেন জানো?
জানি প্রভা। মায়েরা সব জানে!

একদিন প্রভা তার মায়ের সাথে এক হোমিও ডাক্তারের চেম্বারে যায়। প্রভার মা তার কিছু সমস‍্যার জন‍্য হোমিও চিকিৎসাই নিয়ে যাচ্ছেন। এসব ঔষধের ওপর তার অগাধ আস্থা।

ঐ সময়টি বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেলেও প্রভার মায়ের ডাক আসছে না দেখে প্রভা ডাক্তারের সহকারীর নিকট জানতে চাইলেন আর কত সময় লাগবে?
আর অল্প কিছুক্ষণ।

এরপর ভেতর থেকে এগারো কি বারো বছরের একটি গ্রামগঞ্জে বসবাসকারী কিশোরী মেয়েটি চোখ মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসতে দেখলো প্রভা।প্রভা বরাবরই বেশ সাহসী। সে নিজেকে আর দশটা সাধারণ মেয়েদের মত ভাবে না।প্রতিনিয়তই সে তার আসল পরিচয় ‘মানুষ’ সেটি মনে করে নেয়। সরাসরি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলো কি হয়েছেরে মনি?
ভরসা পেয়ে মেয়েটির কান্না আরো একটু যেন বেড়ে গেল। প্রভা জানতে চাইল কার সাথে এসেছো?মামার সাথে। কোথায় সে?

মেয়েটি বললো একঘন্টা হয়েছে মামা আসছি বলে আসছে না। আচ্ছা। কেন কাঁদছিলে বলো?
এবার ডাক্তারের সহকারী বয়স প্রায় তেতাল্লিশ হবে মেয়েটিকে জোরে করে ধমক মারতেই প্রভা উঠে কলার চেপেই দু চারটি চর কষে মারল লোকটির গালে। আবার মেয়েটিকে চেকাপের নামে হোমিও বয়স্ক চিকিৎসকের হাবভাব দেখে প্রভার বুঝতে আর কিছু বাকি রইলো না।

এবার যা হয়েছিল এতটা আশা বোধহয় উপস্থিতরত বাকি রোগীদের কল্পনারও বাইরে ছিল।বয়স্ক চিকিৎসক খানিকটা ভয়ে ভয়ে ধমকের সুরে প্রভাকে বলল, চুপ করে বসো মে!

চুপতো করবো না হলে তোরা দীর্ঘজীবি হবি কিভাবে?
হ‍্যাঁ।

মূহুর্তেই বসার বেঞ্চ তুলে চারিপাশ লন্ডভন্ড করে দিল প্রভা। চেয়ার ছুড়ে মারলো মুখোশধারী হোমিও চিকিৎসকের মুখ বরাবর।

আচমকা এরূপ দেখে দু একজন এগিয়ে আসলেও প্রভার অগ্নিমূর্তির সামনে তা অতি দূর্বল সাহসিকতা।

এতগুলো আপনারা মানুষ না অন‍্যকিছু? চোখের সামনে অন‍্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কেন আমরা নারী বলে?

সেই দিন শেষ! আজ থেকে একটা মুহুর্তও মেনে নেবো না আর কোন মা কিংবা বোনের চোখের পানি!অনেক দেখেছি আর শুনেছিতো তোমাদের পৈশাচিক কাহিনী! আর কত!

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪০ বার

[hupso]
Shares