সর্বশেষ

» দুঃখ কষ্ট, সুখ শান্তি ও আশা ভরসা নিয়ে কিছু কথা ।। শওকত আখঞ্জী ।। আমার সিলেট বিডি ডটকম

প্রকাশিত: 19. September. 2020 | Saturday

দুঃখ কষ্ট, সুখ শান্তি ও আশা ভরসা নিয়ে কিছু কথা : শওকত আখঞ্জী

সুন্দর এই বসুন্ধরায় মানুষের জীবন অতি সংক্ষিপ্ত।
প্রতিটা মানুষের আছে হরেক রকম দুখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি, আশা-ভরসা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সফলতা বা বিফলতার জীবন। তার মধ্যে নানা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়েই মানুষ ব্যক্তি জীবনে পথচলায় তার আচার-আচরণ বহিপ্রকাশ ঘটে।

প্রত্যেকে জীবন যাপনের অংশে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ফলাফলে যেনো অনন্ত আশা- আকাঙ্খা নিয়ে আফসোস করে। তারা কোনদিন তা পরিপূর্ণ করতে পারে অথবা তারা কোনো দিনই পরিতৃপ্ত হতে পারে না।

কেউ কেউ আছেন কঠোর পরিশ্রম করে সফল হন তা হলো মহান স্রষ্টার দেয়া অশেষ নেয়ামত! প্রকৃত পক্ষে সুখ-শান্তির প্রত্যাশা হলো : মানুষদের সহজাত প্রবণতার অদ্ভুত ভিন্ন দিক।

সুখ-শান্তি জোর-জবরদস্তি করে আশাও করা যায়না অথবা জোর করে কখনোই আদায় করা যায় না। ইসলাম বলে : সুখের ভিত্তি বিশ্বাস আস্থা ভরসা কৃতজ্ঞতা রিজিক ও ভাগ্যের ওপর সন্তুষ্টি তৃপ্তি ও আশাবাদিতা।

জীবনে যা পাওয়া গেছে তা নিয়ে ইতিবাচক ভাবনা, আর যা পাওয়া যায়নি! তা নিয়ে না ভাবা।
সব সময় নিজের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিকে দেখা, বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পরিবার ও শ্রেণিকে না দেখা। এভাবে চললে মন বিচলিত ও নিক্ষিপ্ত হওয়ার বদলে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হবে।

সেজন্যই বলা হয় : “ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ”
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন : “আমি তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছি ও তার মধ্যে রিজিকের ব্যবস্থাও করেছি, তোমরা খুব অল্পই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো”

রাসুল সা. বলেছেন : প্রকৃত সুখ ও ঐশ্বর্য হচ্ছে অন্তরের সুখ ও ঐশ্বর্য। তিনি আরো বলেন : মানুষকে যত নেয়ামত দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে কৃতজ্ঞ অন্তর, যে ব্যক্তি পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে আল্লাহকে রব, ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা এবং মুহাম্মদ সা. কে নবী হিসেবে কবুল করে নিয়েছে, সেই ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানের স্বাদ লাভ করেছে, বস্তুত ঈমানই সুখের চাবিকাঠি।”

বৌদ্ধ ধর্মের নেতা দলাইলামা বলেছিলেন : “আমি মনে করি যে, সুখ খোঁজাই হচ্ছে আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য” এরপর তিনি বলেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন হৃদয় ও মনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং শাসন করে সুখ লাভ করা যেতে পারে। “পরিপূর্ণ সুখ লাভ করার জন্য যা যা দরকার তার মধ্যে মনই হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার।”

অন্যদিকে, যীশুর কথা বিবেচনা করুন। ঈশ্বরের ওপর তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো এবং তাঁর শিক্ষা শত শত বছর ধরে কোটি কোটি লোকের ওপর গভীর ছাপ ফেলেছে। মানুষের সুখের বিষয়ে যীশু আগ্রহী ছিলেন। পাহাড়ে দেওয়া তাঁর বিখ্যাত উপদেশে বলেছিলেন তিনি লোকেদেরকে তাদের “হৃদয় ও মন পরীক্ষা করতে,পরিষ্কার রাখতে এবং শাসন করতে শিক্ষা দিয়েছিলেন। মন থেকে হিংস্রতা, অনৈতিক ও স্বার্থপর চিন্তাভাবনা দূর করে শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন আর প্রেমপূর্ণ চিন্তাভাবনা রাখতে বলেছিলেন।

সত্যিকারের সুখ পেতে হলে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে হবে। মানুষকে একা থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। অর্থাৎ আমরা সহজাতভাবেই দলবদ্ধ হয়ে বাস করা, যদি নিজেদেরকে আলাদা রাখি বা সবসময় অন্যদের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করি, তাহলে আমরা সত্যিকারের সুখী হতে পারবো না। যদি আমরা অনুভব করি যে, অন্যেরা আমাদেরকে ভালোবাসে এবং আমরাও যদি অন্যদেরকে ভালোবাসি, তাহলেই আমরা সুখী হতে পারব। যীশু শিখিয়েছিলেন, এই ধরনের প্রেমই হল ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মূলসূত্র, ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে মানুষ কখনোই সত্যিকারের সুখী হতে পারে না”

ইসলাম ধর্ম চেয়েছে দেহ এবং মনের প্রয়োজন সমভাবে পূরণ করতে পারলে মানুষ পেতে পারে সুখের সন্ধান। তার জন্য মানুষের বিজ্ঞতার আলোকেই পরিশ্রম করা প্রয়োজন। সমগ্র পৃথিবীতে এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না যে, তারা সুখী হতে চায় না। আসলে যার যা চিন্তা সে সেই চেতনাতেই যেনো সুখী হতে চায়। অনেকেভাবে অর্থকড়ি, শিক্ষা-দীক্ষা, বিবাহ, সন্তান-সন্ততি, পরিবার, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি মানুষকে অনেক সুখী করতে পারে। সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরিপ করে দেখা গেছে, এ সকল অর্জন আসলে মানব জাতিকে সুখী করতে পারে না। লাখ লাখ মানুষদের জন্যেই প্রকৃত সুখ যেন হয় যায় সোনার হরিণ।

সারা দুনিয়া খুব সুন্দর এবং তাকে উপভোগ বা সুখ-শাস্তি জন্য মানুষের আছে স্বাধীনতা। এই দুনিয়াকে যেমন পেয়েছে মানুষ। তেমনি সেখানেই অনেক সুখ লাভের প্রকৃৃত পন্থাকে সৃষ্টি করেছে মহান সৃষ্টিকর্তা। এই মানুষদের আনন্দ, ভোগ-বিলাস অথবা সৌন্দর্য উপভোগে যেনো আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে আছে প্রতিদান। তার কাছে এ দুনিয়া আখেরাতের সাথেই সম্পৃক্ত, দৈহিক ও শারীরিক আনন্দ উপভোগ করা অন্তরের আনন্দের সাথেই যেন যুক্ত। তাই দুনিয়াতে ভোগের মাধ্যমেই অর্জিত সুখ কিংবা শান্তি মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিতুষ্টি কিংবা প্রশান্তির সাথেই সম্পৃক্ত থাকে।

আবার যারা মনে করে যে ‘সুখ’ হয়তো গাড়ি, বাড়ি, অলঙ্কার, কাপড়-চোপড় কিংবা ধন-দৌলতের মধ্যে আছে। কিন্তু এই সব প্রাপ্তি মানুষকে সাময়িকভাবে কিছুটা সুখ দিতে পারলেও যেন প্রকৃত পক্ষেই স্থায়ী সুখ প্রাপ্তির জন্য এধরণের বহু চাহিদাগুলোও বড় ভূমিকা পালন করে না। এমন কথাগুলো সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাই মনে করে থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুখ বৈষয়িক বা জাগতিক কোনো ব্যাপার নয়। সুখটা হল বহুলাংশে মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাপার। সুখপ্রাপ্তির জন্য আসলেই কোনো ‘শর্টকাট পদ্ধতি কিংবা রাস্তা’ নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ দিনের চব্বিশ ঘণ্টাতে সুখি হিসেবে থাকে না। তাদের জীবনে যেন- হতাশা, দুঃখ-কষ্ট আছে। পার্থক্য হলো সুখী মানুষরা হতাশা, দুঃখ-কষ্টকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে। অন্যরা তা পারেন না। মানব শরীরটা শুধুই রক্ত-মাংসে গড়া কোনো জড়বস্তু নয়। আছে আত্মা যা কিনা শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবেগ-অনুভূতিই শরীরের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। বস্তু জগতে কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা, মোহ, মাৎসর্য, ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা আমাদের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, অসুখ এবং ধ্বংসের মূলকারণ। মানুষ তার সততা, সৎ কর্ম বা অটল সৃষ্টিকর্তা প্রীতি দ্বারা উল্লিখিত বদগুণ থেকে নিজকে দূরে রেখে এই পার্থিব জীবনে পরম স্বর্গসুখ লাভ করতে পারে।

একসময়ে মনে হতো সুখের চেয়ে শান্তি ভালো। সেই সময়েই মানুষ, সুখ আর শান্তিকে কখনো এক করে দেখতে চায়নি। কিন্তু এখন মনে হয় শান্তি ছাড়া সুখ ভোগ সম্ভব নয়। আর সুখ ছাড়া জীবনে যেন ‘শান্তি’ আসতেই পারে না। “সুখ আর শান্তি” দুটোই আলাদা শব্দ। এদের অর্থের মধ্যে যেনো বিস্তর পার্থক্য আছে। কিন্তু বাস্তবে ”সুখ বা শান্তি” চলে যেনো একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে। সুখ শব্দটি মানুষের দেহনির্ভর। আর শান্তি শব্দটি সে মানুষের মননির্ভর হয়ে থাকে। সুতরাং বাস্তবে শরীরের অস্তিত্বকে বাদ দিয়ে- মনের অস্তিত্বের কথা ভাবা খুবই কঠিন। সারাজীবন মানুুষ বাঁচে নিজ শরীরকে নিয়ে। আবার মৃত্যুতেই শরীরের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না, ফুরায় সুখ-দুঃখের অনুভব।

বংশানুগতি সম্বন্ধীয় স্কাউটের জনক রবার্টস্টিফেনসন স্মিথলর্ড় ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল বলেছেন : “সুখ লাভের প্রকৃত পন্থা হলো অপরকে সুখি করা”। এমন সুন্দর পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছো তারচেয়ে একটু শ্রেষ্ঠতর কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টাও করো, তোমাদের মৃত্যুর পালা যখন আসবে তখন সানন্দে এই অনুভুতি নিয়ে ‘মৃত্য বরন’ করতে পারবে। তুমি অন্তত জীবন নষ্ট করনি কিংবা সাধ্য মতই সদ্ব্যবহার করেছ। তাই এমন ভাবেই সুখে বাঁচতে ও সুখে মরতে প্রস্তুত থাকা প্রতিটি মানুষেরই উচিত। আর হিংস্রতাকে পরিত্যাগ করতে না পারলে মানব জাতি কখনোই পেতে পারে না শান্তি। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতেই দুঃখের বড় কারণ।

হার্ভার্ডের এক মনোবিজ্ঞানী ড্যান গিলবার্ট বলেছে : নিজস্ব সুখ নিজেকেই সংশ্লেষণ করতে হবে। মানুষের সুখ অনেকাংশেই ‘নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অনুভূতি। এ ‘সুখ’ অনেকটা মানুষের কোলেস্টেরল লেভেলের মতো, যা জেনেটিক্যালি প্রভাবান্বিত, আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেন মানুষের আচার-আচরণ বা লাইফ স্টাইল ও খাদ্যাভ্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

জানা দরকার, সুখের বিপরীত শব্দটা হলো অসুখ। যে সুখী নয় সে সুস্থও নয়। অসুখ হতে পারে শারীরিক বা মানসিক। শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও মানুষের জীবনে ‘সুখ’ থাকে না। তবুও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমেই শারীরিক অসুস্থতা বহুলাংশেই সারানো যায়। কিন্তু মানুষ যদি মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, তখন জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। কারণ, মানসিক রোগ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রোগ। সুতরাং সুখকে মাঝে মাঝেই এক ধরনের স্বার্থিক উদ্দেশ্য মনে করা হয়। মানুষের কী আছে- তার ওপর সুখ নির্ভর করে না। মানুষ কী ভাবে তার ওপর সম্পূর্ণ ভাবে যেনো সুখ নির্ভর করে। এককথায় যদি বলা হয় তাহলে, যার যা আছে এবং যে অবস্থায় আছে, তার জন্যেই মানুষকে শোকরিয়া জানিয়ে যদি দিন শুরু করা হয়- তাতে সুখ আসবে। মানুষ যখন যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করেই- তার ভবিষ্যতের সুখ আসতে পারে।

সুতরাং কাজ-কর্ম ও চিন্তা ধারায় পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নিয়ে জীবনটা শুরু করলে সুফল আসবে এবং সুখী হবে। আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, জ্ঞানী-গুণী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান এবং সৎ মানুষ সাধারণত সব সময় সুখী হয়। যারা শুধু নিতে চায়, দিতে জানে না বা চায় না, তারা সুখী হয় না।

মহান সৃষ্টি কর্তার ওপর যার বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, এই বস্তু জগতে তিনিই তত সুখী। ‘সুস্থ, সুন্দর এবং সুখী’ জীবনযাপনের জন্যেই প্রকৃতিতে হাজারও নিয়ামত রয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গত উন্নয়নের ফলে বা বিশ্বাস প্রক্রিয়ার প্রভাবেই যেন ‘প্রাকৃতিক জীবন’ থেকে সরে এসে কৃত্রিম, অসুস্থ, ক্ষতিকর বা অসুখী জীবনধারণের প্রতিই ঝুঁকে পড়ছে মানুষ। প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে যেনো বিশ্বজুড়েই লাখো-কোটি মানুষের শরীর, মন কিংবা আত্মার ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করার মাধ্যমেই- মানুষরা অতি সহজে সুস্থ, সুন্দর ও সুখী জীবনের অধিকারী হতে পারে।
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের কল্যাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ওইকিপিডিয়ার মাধ্যমে অনেক তথ্য জানা যায়, শেখা যায়, তাই আসুন ভালো সব শিখি, মন্দসব বর্জন করি।

লেখক :
শওকত আখঞ্জী
উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২৪ বার

[hupso]
Shares