সর্বশেষ

» রাধারমণ দত্তকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত তথ্য সমাহার ।। শওকত আখঞ্জী ।। আমার সিলেট

প্রকাশিত: 15. September. 2020 | Tuesday

রাধারমণ দত্তকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত তথ্য সমাহার : শওকত আখঞ্জী

বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি, সাহিত্যিক, সাধক, বৈঞ্চব বাউল, ধামালি নৃত্য-এর প্রবর্তক রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ
সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি রাধারমণ, ভাইবে রাধারমণ বলেই সমাধিক পরিচিত।
জন্ম ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ,১২৪০ বাংলা-মৃত্যু-১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৩২২ বাংলা) ধারমণ দত্তের পিতা হলেন খ্যাতিমান লোককবি রাধামাধব দত্ত এবং মাতা হলেন সুবর্ণা দেবী। রাধারমণ দত্ত ১২৫০ বঙ্গাব্দে পিতৃহারা হন তখন মা সুবর্ণা দেবীরকাছে বড় হতে থাকেন।

রাধারমণ দত্তের বংশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো : সিলেট অঞ্চলের তৎকালীন শ্রীহট্টের পঞ্চখণ্ডে ত্রিপুরাধিপতি ধর্ম ফাঁ কর্তৃক সপ্তম শতকে মিথিলা হতে আনিত প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্রাহ্মণের মধ্যে আনন্দ শাস্ত্রী নামক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রাধারমণ দত্তের পুর্ব পুরুষ ছিলেন বলে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির ঐতিহাসিক গ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে পাওয়া যায়। আনন্দ শাস্ত্রীর প্রৌপুত্র নিধিপতি শাস্ত্রীর পুত্র ভানু নারায়ণ নামক ব্যক্তি তৎকালীন মণুকুল প্রদেশে “ইটা” নামক রাজ্যের স্থপতি। উক্ত ভানু নারায়ণের চার পুত্রের মধ্যে রামচন্দ্র নারায়ণ বা ব্রহ্ম নারাণের এক পুত্র ছিলেন প্রভাকর। মুঘল সেনাপতি খোয়াজ উসমান দ্বারা ইটা রাজ্য অধিকৃত হলে এই রাজ বংশের লোকগণ পালিয়ে গিয়ে আশে পাশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহন করেন । এ সময় প্রভাকর দত্ত তার পিতার সাথে আলিসারকুল চলে যান এবং সেখানে কিছু দিন বসবাস করার পর জগন্নাথপুর রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন।

কিছু দিন পর জগন্নাথপুর রাজ্যের তৎকালীন অধিপতি রাজা বিজয় সিংহের অনুমতিক্রমে প্রভাকর জগন্নাথপুরের নিকটস্থ কেশবপুর গ্রামে বাড়ী নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করেন।
পরবর্তিতে রাজা বিজয় সিংহ প্রভাকরের পুত্র সম্ভুদাস দত্তকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন।
অতপর বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ খা বা হবিব খার সাথে বিবাদে জগন্নাথপুর রাজ বংশের বিপর্য্যয়ের কারণ, রাজআশ্রীত কর্মচারিরাও দৈন্য দশায় পতিত হন। এ সময় সম্ভুদাস দত্তের পুত্র রাধামাদব দত্ত অন্যের দ্বারাস্থ না হয়ে, অনন্যচিত্তে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় জয়দেবের বিখ্যাতগ্রন্থ গীতগোবিন্দ’
বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া তার রচিত ভ্রমর গীতিকা, ভারত সাবিত্রী, সূর্যব্রত পাঁচালি, পদ্ম-পুরাণ ও কৃষ্ণলীলা গীতিকাব্য উল্লেখযোগ্য। এই প্রসিদ্ধ কবি রাধামাধব দত্তই ছিলেন রাধারমণ দত্তের পিতা রাধারমণ দত্ত তাঁর রচিত ধামাইল গান সিলেট ও ভারতে বাঙালীদের কাছে পরম আদরের ধন।

রাধারমণ নিজের মেধা ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কৃষ্ণবিরহের আকুতি আর না পাওয়ার ব্যথা কিংবা সব পেয়েও না পাওয়ার কষ্ট তাকে সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরণের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন। সাধনা ও বৈরাগ্য কবি রাধারমণের পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উপাসনার প্রধান অবলম্বন সংগীতের সংগে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই। খ্যাতিমান লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দ এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত ও সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল।

১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রামে শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। পিতার রচিত গ্রন্থ গুলো সে সময় তাঁর জন্য পিতা আদর্শ হয়ে অন্তরে স্থান করে নিল। কালক্রমে তিনি একজন স্বভাবকবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। রচনা করেন হাজার হাজার বাউল গান। লিখেছেন কয়েকশ ধামাইল গান। ধামাইল গান সমবেত নারীকন্ঠে বিয়ের অনুষ্ঠানে গীত হয়। বিশেষত সিলেট, কাছাড়, ত্রিপুরা ও ময়মসিংহ অঞ্চলে একসময় এর প্রচলন খুব বেশি ছিল। রাধারমণ দত্ত একাধারে গীতিকার, সুরকার, ও শিল্পী ছিলেন। জানা যায় সাধক রাধারমণ দত্ত ও মরমি কবি হাসন রাজার মধ্যে যোগাযোগ ছিল। অন্তরের মিল ছিল খুব বেশী। তাঁদের মধ্য বিভিন্ন সময় পত্রালাপ হতো কবিতায়। একবার হাসন রাজা রাধারমণের কুশল জানতে গানের চরণ বাঁধেন : রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়। উত্তরে রাধারমণ লিখেন:- কুশল তুমি আছো কেমন- জানতে চায় রাধারমণ।

রাধারমণ একজন কৃঞ্চ প্রেমিক ছিলেন, কৃঞ্চবিরহে তিনি লিখেছেন অসংখ্য গান,এসব গানের মধ্যে বিখ্যাত অন্যতম গান হচ্ছে :

ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।
ভ্রমর রে, কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া মুই রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণ হারা হইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।
ভ্রমর রে,আগে যদি জানতামরে ভ্রমর,
যাইবারে ছাড়িয়া, মাথার কেশও দুই’ভাগ করি
রাখিতাম বান্দিয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।
ভ্রমর রে, ভাইবে রাধারমন বলে শোনরে কালিয়া
নিব্বা ছিলো মনের আগুন
কে দিলা জ্বালাইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।

কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া।
অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া।।
ঘর বাঁধলাম প্রাণবন্ধের সনে কত কথা ছিল মনে গো।
ভাঙ্গিল আদরের জোড়া কোন জন বাদী হইয়া।।
কার ফলন্ত গাছ উখারিলাম কারে পুত্রশোকে গালি দিলাম
গো।
না জানি কোন অভিশাপে এমন গেল হইয়া।।
কথা ছিল সঙ্গে নিব সঙ্গে আমায় নাহি নিল গো।
রাধারমণ ভবে রইল জিতে মরা হইয়া।।

তিনি বাল্যাবধি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ও ধর্মানুরাগী ছিলেন। শাস্ত্রীয় পুস্তকাদীর চর্চা ও সাধু সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে এসে তিনি শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যদি নানা মত ও পথের সঙ্গে পরিচিত হন।
কবির সংসারজীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।

শুধু জানা যায় রাধারমণ-গুণময় দেবীর ৪ ছেলে ছিলো ছেলে তাদের নাম ছিলো রাজবিহারী দত্ত,নদীয়াবিহারী দত্ত, রসিকবিহারী দত্ত ও বিপিনবিহারী দত্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় একমাত্র পুত্র বিপিনবিহারী দত্ত ছাড়া বাকি ৩ পুত্র এবং স্ত্রী গুণময় দেবী অকালে মারা যান। স্ত্রী ও পুত্রদের পরলোক গমনে কবি রাধারমণ দত্ত সংসারজীবন সম্পর্কে তিনি উদাসীন হয়ে পড়েন।

১২৯০ বঙ্গাব্দে ৫০ বছর বয়সে কবি চলে যান মৌলভীবাজার জেলাধীন ঢেউপাশা গ্রামে সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে। তিনি তাঁর কাছে শিষ্যত্ব লাভ করেন। শুরু হয় কবির বৈরাগ্য জীবন। আরম্ভ করেন সাধনা।
গৃহত্যাগ করে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের পাশে একটি আশ্রম তৈরি করেন। এখানে চলে তাঁর সাধন-ভজন।

কবি নিজেই গেয়েছেন :
শ্যামের বাঁশিরে ঘরের বাহির করলে আমারে
যে যন্ত্রণা বনে যাওয়া গৃহে থাকা না লয় মনে॥
নলুয়ার হাওরের আশ্রম দিবা রাত্র সাধনা ও ইষ্ট নামে মগ্ন এবং অসংখ্য ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন।
ধ্যান মগ্ন অবস্হায় তিনি গান রচনা করে গেয়ে যেতেন। ভক্তরা শুনে শুনে তা স্মৃতিতে ধরে রাখত এবং পরে তা লিখে নিত।
রাধারমণের গীতি সংগ্রাহক
বিভিন্ন সংগ্রাহকদের মতে, রাধারমণে গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও উপরে।
রাধারমণ দত্তের গানের বেশ কিছু গানের বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রথমে রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
কলকাতা থেকে বাউল কবি রাধারমণ নামে ৮৯৮টি গান নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

মোহাম্মদ মনসুর উদ্দীন তার হারামনি গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডে রাধারমণের ৫১টি গান অন্তর্ভুক্ত করেন।
সিলেটের মদন মোহন কলেজের সাহিত্য পরিষদ থেকে রাধারমণ সঙ্গীত নামে চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষনের সংগৃহীত একটি গ্রন্থ ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়াও গুরুসদয় দত্ত, নির্মলেন্দু ভৌমিক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, কেতকী রঞ্জন গুণ, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, হুছন আলী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, নরেশ চন্দ্র পাল, যামিনী কান্ত র্শমা, মুহম্মদ আসদ্দর আলী, মাহমুদা খাতুন, ডঃ বিজন বিহারী পুরকাস্থ, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, মোঃ আজিজুল হক চুন্নু, জাহানারা খাতুন, নরেন্দ্র কুমার দত্ত চৌধুরী, অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র পাল, অধ্যাপক দেওয়ান মোঃ আজরফ , শামসুর করিম কয়েস সহ আরও অনেক গুণিজন রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহ করেছেন।

কবির আরো কয়েকটি জনপ্রিয় গান:-
প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্বতলে বাঁশি বাজায় কে।
বাঁশি বাজায় কে রে সখি, বাঁশি বাজায় কে॥
এগো নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি, তারে আনিয়া দে।
অষ্ট আঙ্গুল বাঁশের বাঁশি, মধ্যে মধ্যে ছেদা
নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি, কলঙ্কিনী রাধা॥
কোন বা ঝাড়ের বাঁশের বাঁশি, ঝাড়ের লাগাল পাই।
জড়ে পেড়ে উগরাইয়া, সায়রে ভাসাই॥
ভাইবে রাধারমণ বলে, শুন গো ধনি রাই।
জলে গেলে হবে দেখা, ঠাকুর কানাই॥
শ্যামল বরণ রূপে মন নিল হরিয়া
কুক্ষণে গো গিয়াছিলাম জলের লাগিয়া
কারো নিষেধ না মানিয়া সখি গো।।
আবার আমি জলে যাব ভরা জল ফেলিয়া
জল লইয়া গৃহে আইলাম প্রাণটি বান্ধা থুইয়া
আইলাম শুধু দেহ লইয়া সখি গো।।
কি বলব সই রূপের কথা শোন মন দিয়া
বিজলি চটকের মতো সে যে রইয়াছে দাঁড়াইয়া
আমার বাঁকা শ্যাম কালিয়া সখি গো।।
ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
মনে লয় তার সঙ্গে যাইতাম ঘরের বাহির হইয়া
আমি না আসব ফিরিয়া সখি গো
মান ভাঙ রাই কমলিনি চাও গো নয়ন তুলিয়া
কিঞ্চিত দোষের দোষী আমি চন্দ্রার কুঞ্জে গিয়া।
এক দিবসে রঙে ঢঙে গেছলাম রাধার কুঞ্জে
সেই কথাটি হাসি হাসি কইলাম তোমার কাছে।
আরেক দিবস গিয়া খাইলাম চিড়া পানের বিড়া
আর যদি যাই চন্দ্রার কুঞ্জে দেওগো মাথার কিরা।
হস্তবুলি মাথে গো দিলাম তবু যদি না মান
আর কতদিন গেছি গো রাধে সাক্ষী প্রমাণ আন।
নিক্তি আন ওজন কর দন্দলে বসাইয়া
অল্প বয়সের বন্ধু তুমি মাতি না ডরাইয়া।
ভাইরে রাধামরণ বলে মনেতে ভাবিয়া
আইজ অবধি কৃষ্ণনাম দিলাম গো ছাড়িয়া।
কৃষ্ণ আমার আঙিনাতে আইতে মানা করি।
মান ছাড় কিশোরী।
যাও যাও রসরাজ, এইখানে নাহি কাজ
যাওগি তোমার চন্দ্রাবলীর বাড়ি।
চন্দ্রাবলীর বাসরেতে সারারাত পোহাইলার রঙ্গে
এখন বুঝি আইছ আমার মন রাখিবারে।
ভাবিয়া রাধারমণ বলে দয়ানি করিবে মোরে
কেওড় খোলো রাধিকা সুন্দরী।

কৃষ্ণ বিরহের আকূতি আর না-পাওয়ার ব্যথা কিংবা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাকে সাধকে পরিণত করেছিল। সেরকমি একদিন হয়েছিল এই গানের শুভ সূচনা। রাধারমন দত্ত ধ্যানে বসে গান গাইতেন আর সেই গানগুলিকে সংগ্রহ করতেন উনার প্রিয় শিষ্যরা। তবে তিনি কোনদিন কাউকে এই গানগুলিকে পান্ডুলিপি আকারে লিখে রাখতে বলেননি। নলুয়ার হাওরের আশ্রম দিবা রাত্র সাধনা ও ইষ্ট নামে মগ্ন এবং অসংখ্য ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন। ধ্যান মগ্ন অবস্হায় তিনি গান রচনা করে গেয়ে যেতেন।

ভক্তরা শুনে শুনে তা স্মৃতিতে ধরে রাখত এবং পরে তা লিখে নিত। এমনি একদিন তিনি আশ্রমের সামনে থাকা পুকুরপাড়ে বসে অনর্গল ক্রন্দন করে যাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল রাধারমন দত্ত আজ বুঝি জন্মের কান্নায় মেতে উঠেছেন, গুরুদেবের কান্না দেখে শিষ্য গিয়ে প্রশ্ন করলেন, গুরুদেব আপনার কি হয়েছে? আপনি এরকম কেন ক্রন্দনে আখি ভরিয়ে বিলাপ করছেন? তিনি শিষ্যের প্রশ্নত্তোরে বলে উঠেন, মাতা-পিতা, স্ত্রী-পুত্র এবং স্বজনদের হারিয়ে আজ আমি দিশেহারা। আমার দেহ মন আজ বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বার বার আমার মায়ের কথা মনে পড়ছে। আমি আমার মাকে দেখতে চাই। আমার মাকে তোরা এনে দে? গুরুদেবের এই হাল দেখে শিষ্য অন্য সব গুরু ভাইদের ডাকতে শুরু করল! এদিকে রাধারমন
দাড়িয়ে পড়লেন, দু-নয়ন মুদিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে বসিলেন ইষ্ট ধ্যানে। রাত গভীর হতে চলল! শিষ্যরা সবাই নিদ্রাপাতে চলে গেলো তখন রাধারমণ সেই পুকুর পাড়ে ধ্যানে বসে গেলেন। রাত আনুমানিক তখন তিন ঘটিকা বা তার বেশী হবে। নির্জন কেশবপুরের নলুয়ার হাওরের এক পারে আশ্রম ছিল এই সাধক বৈষ্ণব কবির। তিনি আপন মহিমায় এই নির্জন স্থানে বসে টান দিলেন বিখ্যাত সেই কালজয়ী গান ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’ কোথা হতে যেনো এক অদৃশ্য বাঁশের বাঁশির সুর গানে মিশ্রিত হয়ে চারদিকে করুন এক প্রতিধ্বনী ছড়াতে লাগল। শিষ্যগন গানের সুরের মোহিত হয়ে ঘুম থেকে উঠে চাঁদের আলোতে দেখতে পাইলো গুরুর দু-নয়ন থেকে সমানে অশ্রুজল বাইতেছে আর গুরু গেয়ে যাচ্ছেন আপন মহিমায় এই কৃষ্ণ বিরহী গান।
গুরুকে এই ধারুন বিরহে ডুবতে দেখে শিষ্যগনও চোখের জলে ভিজতে থাকলেন।
কিন্তু শিষ্যগণ এটা বুঝতে পারছিলনে না যে,এখানে শুধুই গুরু একা বসে আছেন! তাহলে এই অদৃশ্য বাঁশের বাঁশির সুর কোথা থেকে বেসে আসিতেছে আর এই গানের সাথে সমানে তাল মিলিয়ে চলেছে কিভাবে। শিষ্যগণের আর বুঝার বাকি থাকলনা এই সুর আর কোথা হতে নয়! এই সুর অবশ্যই কোন শুভ স্থান থেকে বেসে আসছে। শিষ্যগণ তখন গুরুর সামনে বসে সেই গানটিকে পান্ডুলিপি করেন আর সেই গান আজ আমরা শুনে কৃষ্ণ বিরহে ডুবে যাই। তাহলে বুঝুন যিনি গানটিকে রচনা করেছিলেন। তিনি কতটুকু কৃষ্ণ বিরহে ডুবে গিয়েছিলেন সেই মূহুর্তে। শুধু এই গান-ই নয়!
ধ্যানে বসে যখন তিনি গান গাইতেন! তখন সেখানে আষ্মিক ভাবে ঘটতো অনেক ঘটনা।

তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মহান সাধকও বটে। কথিত আছে তিনি তার আশ্রমে শূন্যে আকারে বসে ধ্যান করতেন। সেই ধ্যানের ধারনা দেখে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজা। সুনামগঞ্জের দেওয়ান হাছন রাজা মিউজিয়ামেও রয়েছে রাধা রমনের কিছু চিত্র। মরমি কবি হাছন রাজাও ছিলেন
রাধারমণের খুব প্রিয় একজন ভক্ত। দেওয়ান হাছন রাজা ছিলেন বিনোদিনীর প্রেমে পাগল। সেই বিনোদিনীকে উদ্দেশ্য করে রাধা রমন গেয়েছিলেন “বিনোদিনী গো তর বৃন্দাবন কারে দিয়া যাবি’ রাধারমণ দত্তের বাল্যকালেরও রয়েছে অনেক গল্পকথা যা অনেকে শুনে অবাক হবেন।
তবে রাধারমম দত্তের সমাধী এবং অর্ন্তধান নিয়ে রয়েছে অনেক দ্বিমত। অনেকেই মনে করেন, তিনি একটা সময় কোথাও চলে যান। আবার অনেকেই মনে করেন উনার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, আবার অনেকেই মনে করেন তিনি আশ্রমের পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ডুব দিয়ে  লীন হয়ে যান।
তবে তিনি যেখানেই থাকেন না কেনো আমাদের দিয়ে গিয়েছিনে অসংখ্য সংগীতের ভান্ডার। বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোক কবি রাধারমণ দত্ত একজন মহান কবি এবং বৈষ্ণব ছিলেন।
তার স্মৃতি ঘেরা কেশবপুর গ্রামে ঘুরলে মনে হয় যেন, তিনি আজও কেশবপুরের প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছেন।

১৯৯৭ সালে কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দা তৎকালীন পাটলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর মিয়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেশবপুর গ্রামে মরমী এ কবির শেষ স্মৃতিচিহৃ সমাধি মন্দিরকে ছোট একটি পাকা মন্দির নির্মাণ করে তা সংরক্ষনের ব্যবস্থা করে দেন। ওই ছোট মন্দিরে একটি কুর্শিতে রাধারমণ দত্তের ছোট ছবি ও তার নিজের ব্যবহৃত খড়ম রয়েছে। ওই সমাধি মন্দিরের একপাশে বসবাস করা এক হিন্দু পরিবার যুগ যুগ ধরে বংশপরমপরায় মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষন করছেন।

তথ্যসমাহারকারী লেখক :
শওকত আখঞ্জী
উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া,
শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ, দ্বিতীয় ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, দ্বিতীয় অধ্যায়, জগন্নাথপুরের কথা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৮ বার

[hupso]
Shares