সর্বশেষ

» ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক ব্যাক্তি বর্গের সংক্ষিপ্ত জীবনী

প্রকাশিত: 17. July. 2020 | Friday

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সমগ্র শ্রীহট্টের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এক উজ্জ্বল অধ্যায়,তার মধ্যে সুনামগঞ্জের ব্যক্তিদের ভূমিকা উল্লেখ্য।

সুনামগঞ্জের ইতিহাস সুনামের ইতিহাস আদীকাল থেকেই ঐতিহ্যের সমবৃদ্ধিশীল সুনামগঞ্জ।

সুনামগঞ্জের ইতিহাসে রাজা, বাদশাহসহ জমিদারও ছিলেন যাদের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় এবং তাদের নামের সাথে স্বাভাবিক ভাবে সারা বাংলার মানুষেরা পরিচিত।
অসাধারণ কর্মতৎপরতা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে তারা স্মরণীয় হয়ে আছেন। স্থানীয় পর্যায়ের ইতিহাস চর্চা ও অনুসন্ধানের জন্য আন্দোলন সমূহে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বর্গের পরিচিতি,তাদের মন মানসিকতা,সামাজিক অবস্থান,শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচ্ছন্ন চিন্তাচেতনার ধারাবাহিতা নিরুপন করা জরুরী।

সুনামগঞ্জের যে সকল ব্যাক্তিবর্গ রাজনৈতিক ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সহায়তা প্রদান করেছেন তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলোঃ-

দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ (১৮৬২-১৯২৭)
দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ সুনামগঞ্জ জেলার পানাইল মৌজায় ১২৬২ বাংলায় ৬ই আশ্বিন মোতাবেক জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতার নাম দেওয়ান মোহাম্মদ আসগর।দেওয়ান আসফ দ্বীর্ঘকাল লোকাল বোর্ডের সদস্য ছিলেন।আঞ্জুমান -ই ইসলামীয়া সিলেটের সদস্য ছিলেন। এর তিনি প্রতিষ্টাতা সসভাপতি নির্বাচিত হন। মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণ করাই ছিল আঞ্জুমানের লক্ষ্য। খেলাফত আন্দোলন শুরু হলে তিনি এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং সিলেট জেলা খেলাফত কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন।তিনি ১৯২৭ সালের মার্চ মাসে ইন্তেকাল করেন।

জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী (১৮৮১-১৯৭২)
সুনামগঞ্জের তেমনি এক জমিদার শিক্ষানুরাগী প্রয়াত শ্রদ্ধেয় ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী।

সিলেট শহরের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্টান “সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ” উক্ত কলেজটি জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী তৈরী ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এটা সুনামগঞ্জ বাসীর গর্ব। ইতিহাস ঐতিহ্যের সমবৃদ্ধিশীল অন্যতম নিদর্শন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও’র জমিদার বাড়ি। প্রায় সাড়ে পাচ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তিনশত বছরেরও বেশী পুরাতন এই জমিদার বাড়িটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন ।
জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের কংগ্রেস সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য। ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী জগন্নাথপুর উপজেলার ৯ নম্বর পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইল গাঁও জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বৃটিশ বিরোধী এবং ভারতের স্বাধীনতা অন্দোলনের পূর্ব বাংলায় বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য।
বংশ পরিচয়ের জন্য নিবন্ধ দেখুন সুখময় চৌধুরী বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত আতুয়াজান পরগণার বর্তমান জগন্নাথপুর উপজেলার
পাইলগাঁও গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার বংশে ১৮৮২ সালে জন্মগ্রহণ করেন ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। প্রজাহিতৈষী জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন জমিদার রসময় চৌধুরী তিনি ছিলেন ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর পিতা।

সিলেটের আদালতের উকিল ও ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর দাদা একজন অনারারী ম্যাজিষ্ট্রেট এবং পাইল গাঁওয়ের প্রখ্যাত জমিদার ব্রজেন্দ্রনাথ চৌধুরী। ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সাথে এম.এ পাস করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯০৬ সালে তিনি বি.এল পরিক্ষা দেন এবং ১৯০৭ সালে সিলেট বারে যোগ দিয়ে বছর খানেক ওকালতি প্র্যাকটিস্‌ করেন।
তাঁর কর্ম জীবনের শুরুতে প্রথমত সিলেট বারে উকিল হিসেবে যোগ দেন। ১৯০৮ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়। এ সময় ওকালতি ত্যাগ করে পাইলগাঁওয়ের জমিদারি ষ্টেটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তখন থেকে তিনি রাজনীতি ও সমাজসেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯১৯ সালে তাঁর চাচা সুখময় চৌধুরীর উদ্যোগে নিজ তত্বাবধানে স্থাপিত হয় পাইলগাও ব্রজনাথ উচ্চ বিদ্যালয়।
১৯২৬ সালে তার পিতা রসময় চৌধুরীর নামে সিলেট শহরে চাচার সহযোগী হয়ে রসময় মেমোরিয়াল হাই স্কুল স্থাপন করেন। ১৯৩৯ সালে সিলেট চৌহাট্টাস্থিত নিজ বাড়িতে সিলেট মহিলা কলেজ স্থাপিত করেন এবং উক্ত কলেজে দুই বৎসর তিনি অবৈতনিক অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।এই কলেজটি ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রয়াত জমিদার জনাব ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী যখন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে সিলেট যখন পুণরায় আসামে যুক্ত হয় সেই থেকে তিনি সিলেটকে বঙ্গ প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে রাজনীতে যোগদেন। এ সময় রায় বাহাদুর গিরিশ চন্দ্র নাগ ও রায় বাহাদুর রমণী মোহন দাস তার সহকর্মী হিসেবে সঙ্গী হয়েছিলেন। ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী স্বরাজ্য দলের নেতা হিসেবে কাজ করেন।
সুরমা উপত্যকা রাষ্ট্রীয় সম্মিলনের ষষ্ঠ অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি মনোনিত হন।
সুনামগঞ্জ জেলায় অনুষ্টিত এ সম্মিলনের সভানেত্রীত্ব করেন শ্রীমতি সরোজিনী নাইডু। ১৯২৯ সালে তিনি সিলেট কাছাড় বন্যা সাহায্য কমিটির অর্গেনাইজার ও সেক্রেটারী নিযুক্ত হন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় জেলা কংগ্রেসের সভাপতি রুপে বিশেষ ভুমিকা রাখেন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন।
১৯৪১ সালে রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণ করে তিনি জনশক্তি প্রেস নামের প্রতিষ্ঠান করে এর সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। বহু দিন এ প্রেসের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
দেশ বিভাগের পর বিভিন্ন হিন্দু পরিবারের লোকজন-সহ হিন্দু নেতারাও যখন ভারতে চলে যান, সে সময় তার বংশীয় অনেক লোক ভারতে পারি জমালেও তিনি স্বদেশের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। তখন নিজ বাড়িতে ও শহরের বাসায় থেকে নিজের স্থাপিত স্কুলসমূহের পরিচালনাসহ বিভিন্ন জনসেবার কাজে অবসর সময় ব্যয় করেন । ১৯৭২ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে কলকাতায় নেয়া হলে ১৩৭৯ বাংলার ভাদ্র মাসের ১৪ তারিখে সেখানেই প্রাণত্যাগ করেন।

ফজলুল হক সেলবর্সী (১৮৮৩-১৯৬৮)
বাংলাদেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক এবং বিপ্লবী ফজলুল হক সেলবর্সী ১৮৯৩ সালে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সাংবাদিকতা আত্ননিয়োগ করেন।১৯২০ সালে তিনি দৈনিক নবযুগের সম্পাদক ছিলেন।১৯২৭ সালে দৈনিক সুলতান,১৯৩৭ সালে দৈনিক তকবীর, ১৯২৪ সালে সাপ্তাহিক মুহাম্মদীর সম্পাদক ছিলেন।১৯৪৬ সালে সাপ্তাহিক মুসলিম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া মাসিক আল আসলাম,সওগাত, মুসলেম ভারত ও ইসলাম দর্শন প্রভূতি বহু পত্রিকা মারফতে বাংলার নির্যাতিত মুসলমানদের একজন হয়ে তিনি লেখনী ধারণ করেন।তার লেখনীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের চেতনা সৃষ্টি মুসলিম নব জাগরণের সৃষ্টি করে।খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে নির্যাতন করেন।তিনি তার লেখনী দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণকে উদ্ভুদ্ধ করতে সহায়তা করেন।তিনি ১৯৬৮ সালে ইন্তেকাল করেন।

করুণা সিন্ধু রায় চৌধুরী (-১৯৪৯)
করুণা সিন্ধু রায় চৌধুরী তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার তাহিরপুর থানার বেহেলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমানে যা জামালগঞ্জ উপজেলা বেহেলী ইউনিয়ন) তার পিতা রায় সাহেব কৈলাস চন্দ্র ছিলেন বিহার গভর্নমেন্ট অধীনে বিভাগীয় সেক্রেটারি ছিলেন।করুণা সিন্ধু রায় বড় চাকুরী পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সে পথে না গিয়ে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩০-৩২ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে ও ১৯৪১ সালে ব্যাক্তিগত সত্যাগ্রহে যোগ দিয়ে বহুবার কারাবরণ করেন। সুরমা উপত্যকার প্রথম কৃষক আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে প্রথম সারির নেতা।তিনি কংগ্রেসের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে আসাম বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন।তার উত্থাপিত “শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ব বিল”কে আসাম সরকার পরবর্তীতে সংশোধন করে আইনে পরিণত করেন। তিনি ১৯৩৭ সনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধবিরোধী সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করেন।এর ফলে সরকার তাকে গ্রেফতার করে কারাদণ্ড প্রদান করেন।জেল থেকে মুক্তি লাভ করে আত্নগোপন করেন।এই অবস্থায় সুনামগঞ্জের বেহেলী গ্রামে ১৯৪৯ সনের ১৯ আগস্ট পরলোকগমন করেন।
(তথ্য সুত্রঃব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শ্রীহট্ট)
সুনামগঞ্জের আরো অনেক সংগ্রামী গুণীজন রয়েছেন আমার সংক্ষিপ্ত লেখনীতে উনাদের ইতিহাস জেনে লেখা সম্ভবপর হয়নি ভবিষ্যৎ জানার সুযোগ হলে লেখার প্রয়াস অবশ্যই রাখি।

লেখক
শওকত আখঞ্জী
উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯৭ বার

[hupso]
Shares